সাতক্ষীরার আশাশুনিতে শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে ব্যতিক্রমী সাজে প্রস্তুত হচ্ছে প্রতিমা। উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরে ১৩টি প্রতিমা সাজানো হচ্ছে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা দিয়ে। প্রতিমার শরীর ও অলংকারে মুক্তার কারুকাজে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে নান্দনিক নকশা।
বুড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থিত মন্দিরটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিমাশিল্পী ও কারিগরেরা শেষ মুহূর্তের কাজে ব্যস্ত। কোথাও চলছে রঙের কাজ, কোথাও সাজসজ্জা, আবার কোথাও প্রতিমার শরীর ও অলংকারে নিখুঁতভাবে বসানো হচ্ছে মুক্তা। আয়োজকদের হিসাবে, প্রতিমা তৈরিতে মোট ব্যয় হচ্ছে প্রায় চার লাখ টাকা।
প্রতিমাশিল্পী প্রকাশ মণ্ডল গত ৫ জুলাই থেকে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন। চারজন শিল্পী প্রায় আড়াই মাস ধরে কাঠামো তৈরি, মাটির কাজ, অবয়ব, রং, সাজসজ্জা ও মুক্তার কারুকাজের কাজ করছেন।
প্রকাশ মণ্ডল বলেন, প্রতিবছরই নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন তিনি। এবার দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় দেখা কয়েকটি মূর্তির নকশা ও নিজের পরিকল্পনা মিলিয়ে প্রতিমার নকশা করা হয়েছে। মুক্তার কাজ অত্যন্ত সূক্ষ্ম হওয়ায় সময় ও শ্রম বেশি লেগেছে। চারজন শিল্পীর ৫২ দিন সময় লেগেছে। ১৩টি প্রতিমায় প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তা ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অর্ধেন্দু মণ্ডল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মন্দিরটিতে শারদীয় দুর্গোৎসব হয়ে আসছে। ঐতিহ্য ধরে রেখে প্রতিবছরই নতুন কিছু করার চেষ্টা করা হয়। এবার মুক্তার কারুকাজের মাধ্যমে প্রতিমায় ভিন্নতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর মণ্ডল বলেন, পূজার আগেই প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে অনেকে আসছেন। এবারের আয়োজন নিয়ে মানুষের আগ্রহে তাঁরা আনন্দিত। উৎসব সুশৃঙ্খল রাখতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
আয়োজকেরা জানান, ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হবে। অষ্টমীতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং নবমীতে ধর্মীয় যাত্রাপালার আয়োজন থাকবে।
এদিকে বড়দল ইউনিয়নে বিজয়া দশমীর দিন থাকছে বিশেষ আয়োজন। বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা একত্র করে ঐতিহ্যবাহী বুড়িয়া আড়ং মেলার মাধ্যমে বিসর্জন দেওয়া হবে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, বড়দল বাজার, মধ্যম বড়দল, দক্ষিণ বড়দল, বিষ্ণুপুর, ফাকরাবাদ পূর্বপাড়া, কইসিটি ও বুড়িয়াসহ আশপাশের প্রায় ১০টি মণ্ডপের প্রতিমা এতে অংশ নেবে।
স্থানীয় বাসিন্দা অসিত মণ্ডল বলেন, বুড়িয়া আড়ংকে ঘিরে প্রতিবছর মানুষের আলাদা আগ্রহ থাকে। এবার মুক্তার কারুকাজের প্রতিমা সেই আকর্ষণ আরও বাড়িয়েছে।
আরেক বাসিন্দা উত্তম মাস্টার বলেন, এখানে পূজাকে শুধু একটি সম্প্রদায়ের উৎসব হিসেবে দেখা হয় না। সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে উৎসবে অংশ নেন।
উৎসবকে কেন্দ্র করে মণ্ডপের নিরাপত্তায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্বেচ্ছাসেবক দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা পাওয়া যাবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
আশাশুনি পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রনজিত কুমার বৌদ্দ জানান, এ বছর উপজেলায় মোট ১০৬টি মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন মণ্ডপে ব্যতিক্রমী প্রতিমা ও নান্দনিক সাজসজ্জার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বড়দলের বুড়িয়ায় মুক্তাখচিত প্রতিমার পাশাপাশি ঘুঘুমারীতে ঝরনার আদলে এবং বুধহাটা কাছারীবাড়ি ও দক্ষিণ বড়দলে ডাল দিয়ে প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে আশাশুনির দুর্গোৎসবে এবার থাকছে নানা বৈচিত্র্য। তবে বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের ৩৫ হাজার মুক্তায় সাজানো ১৩টি প্রতিমা ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।
সিটি/এইচএইচএসসি